বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফির্ছিলাম। বাঙ্গালাদেশের ওপর বিমাণ পৌছানোর পর সারাক্ষন জানালা দিয়ে বাঙ্গালাদেশের নদী আর সবুজ দেখ্তে দেখ্তে ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছিলাম। বিমাণের চাকা যক্ষণ ঢাকার রানওয়েতে নাম্্ল, তক্ষণ আর ইমোশন ধরে রাখ্তে পারলাম না। চোখ দিয়ে তক্ষণ টপ্ টপ্ করে পাণি পড়ছিল। আমার পাশে বসা এক বিদেশী ভদ্রলোক আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা কর্ল— Anything bad waiting for you? বল্লাম—Not at all, I’m happy to land in my country. Thank you। ভদ্রলোক আর কথা বাড়ালেন না।
এক্ষণ আমি ভাবি, যে ইমোশন নিয়ে আমি আমার দেশে ফিরে এসেছিলাম, সে ইমোশন কি আমার এক্ষণ আছে? আমার দেশ কি আমাকে আমার স্বপ্ন দিতে পেরেছে? উত্তর আমি পাই না, মনে হয় আমি, আমরা, আমাদের দেশ সবাই মিলে সুন্দর স্বপ্নগুলো সব নষ্ট করে ফেলেছি। মাঝে মাঝে তাই রাগ করে আমার আদরের বাঙ্গালাদেশকেই আমি এক্ষণ বকাঝকা করি।
মাঝে মধ্যে আবার দেশের বাইরে গেলে কেন জানি দেশটার কথাই বেশী মনে হয়, মন পোড়ায়। দেশের বাইরে গেলেই মাঝে মধ্যে সেই পুরাতন ইমোশন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মনে পড়ে যায় সেই আমপাতা আর নীল শাড়ীর কথা। আমপাতা আর নীল শাড়ীর গল্প তবে খোলাসা করেই বলি।
বিদেশে পড়াশোনা করার জন্য স্কলারশিপ পেয়ে আমি গিয়েছিলাম অস্ট্রিয়ার সালজবুর্গ সহরে। আমার কোর্সের কিছু অংশ মিউনিখ ইউনিভার্সিটীতে কর্তে হয়েছিল। আমি যক্ষণ সালজবুর্গে গিয়েছিলাম, তক্ষণ একজনো বাঙ্গালী ছিল না সেখানে। মাঝে মধ্যে তাই নিজেই নিজের সাথে বাঙ্গালায় কথা বল্তাম। দেশের কথা এতৈ মনে হৈত যে মাঝে মাঝে ভীষণ হোমসিক হয়ে পড়্তাম। এইভাবে ছয় মাস কেটে যাবার পর স্টাডী ট্যুরে একবার ভিয়েনা যাচ্ছিলাম। পথে দানিউব নদীর তীরে মেল্খ মনেস্ট্রী দেখার জন্য আমাদের বাস থাম্ল। মনেস্ট্রী দেখার পর ফিরে এসে দুপুরের খাবার আগে হঠাৎ খেয়াল কর্লাম দানিউব নদীর তীর ঘেঁসে একটা আমগাছ দাড়িয়ে আছে। আমি প্রায় পাগল হয়ে গেলাম আম গাছটী ধরে দেখার জন্য। আমার মনে হচ্ছিল ঐ আমগাছটায় বাঙ্গালাদেশ আছে। কাওকে কিছু না বলে, কিছু না খেয়ে, উঁচুনীচু পাথর আর জলাভুমী অতি কষ্টে পার হয়ে আম গাছটার কাছে গেলাম। দুইহাত বাড়িয়ে খুব আদর করে তুলে আন্লাম আমগাছের দুইটা পাতা। কিন্তু হায়, আমি দেখ্তে পেলাম গাছটা আমগাছ নয়, আমগাছের মত দেখ্তে অন্য কোন গাছ। এত হতাশ হৈলাম যে আমার চোখ ভিজে গেল। ফিরে এসে দেখি আমার জন্য সবাই অপেক্ষা কর্ছে। আমাদের টিচার ডঃ ওয়েইছ অল্প সল্প বকা দিলেন আমাকে। কিছু না খেয়েই রওয়ানা কর্লাম ভিয়েনার দিকে।
ভিয়েনা গিয়ে ভাব্লাম, ছয় মাস বাঙ্গালা বলি না, এবার নিশ্চয় বলা যাবে। কিন্তু কোথায় যে বাঙ্গালী পাব, তাহা ত জানা নেই। আর মাত্র দুইদিনের জন্য বেড়াতে এসে বাঙ্গালী খুঁজে বের করাও প্রায় অসম্ভব। তাই আমার একমাত্র ভরসা ছিল রাস্তাঘাটে বাঙ্গালী ধরা। একদিন মারিয়া হিল্ফাস্ট্রাসেতে ঘুরে বেড়ানোর সময় হঠাৎ দেখ্তে পেলাম অনেক দূরে নীল শাড়ী পড়া এক মহিলা হেটে যাচ্ছেন। আমার মনে হৈল বাঙ্গালী ঐ মহিলার সাথে একটু কথা বল্তে পার্লে কিছুটা হৈলেও বাঙ্গালাদেশকে পাব, তাহার সাথে কথা বল্তেই হৈবে। মারিয়া হিল্ফাস্ট্রাসেতে তক্ষণ প্রচণ্ড ভিড়। আমি লোকজন কাটিয়ে মহিলার দিকে কক্ষণো দৌড়ে কক্ষণো বা জোরে হেঁটে এগুতে লাগ্লাম। মাঝে মধ্যে হারিয়ে ফেল্ছিলাম মহিলাকে, তারপরেও আন্দাজ করে এগুতে এগুতে প্রায়ে বিশ মিনিট পর হাপাতে হাপাতে তার সামনে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস কর্লাম—Excuse me! Are you from Bangladesh? মহিলা উত্তর কর্ল— No, I’m an Indian, I’m from Delhi। আবারো হতাশ হৈলম। মহিলা আমার সাথে কিছুক্ষন কথা বল্লেন। আমিও খুলে বল্লাম আমার মনের অবস্থা। তিনি আমাকে বল্লেন— হিন্দীতে কথা বল্লে কি মন শান্ত হৈবে? আমি বল্লাম— আমি তো হিন্দী জানি না। তক্ষণ তিনি আমাকে ভিয়েনা আই ইনস্টিটিউট কিংবা ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জী কমিসনে যেতে বল্লেন। ওইখানে নাকি কিছু বাঙ্গালী লোকজন আছে। আমার যাওয়া হয়নি, বাঙ্গালী আর বাঙ্গালাদেশকে পেলাম-ও না।
এক্ষণ আমি কি আর আগের মত আছি? মনে হয় না, আমি বদলে গেছি। আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে। তাহারা পড়াশোনায় তুখোড়৷ দুইজনৈ মেলবোর্নের মোনাস ইউনিভার্সিটী থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার পর যক্ষণি দেশের কথা বলেছে, আমি তাদের বলেছি— “অবশ্যই আসবে, তবে একটু অপেক্ষা কর, দেশের অবস্থা কি হয় দেখি।” ইতিমধ্যে তাহারা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক-ও হয়ে গেছে। পিতা হিসেবে আমার এক মন চায় যে তাহারা দেশে ফিরুক, আবার অন্য এক মন চায় না তাহারা দেশে ফিরে এসে এক অসহায় অবস্থায় পড়ুক৷ সত্যি কথা হৈল, আমি মনে হয় চাচ্ছি না তাহারা দেশে ফিরে দেশের সম্পৎ
হয়ে থাক। আবার অন্য দিকে আমি আর আমার স্ত্রী সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশ ছাড়তে চাই না৷ আমি মনে প্রাণে চাই এই দেশে আমার বাবা আর মায়ের কবরের পাশে আমাদের কবর হোক৷
আমার বিবর্ত্তন দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমি আমার দেশের জনগনের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটা প্রশ্ন কর্তে চাই। আমি জান্তে চাচ্ছি, আমার এই বিবর্ত্তনের জন্য দায়ী কে? দায়ী নাকি আমার দেশ, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, নাকি আমি নিজে? প্রথম সত্য হিসাবে আমি আমাকেই কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে দোষী সাব্যস্ত করেছি, কিন্তু ভাব্ছি এই বিবর্ত্তনের প্রেক্ষাপটে আরো কী যেন আছে! …
* চিত্রকর্ম্ম— মুক্তি (চিত্রকর: মঈন চৌধুরী)
মঈন চৌধুরী রচিত ও প্রকৃতিপুরুষ কর্ত্তৃক প্রকাশিত সমসাময়িক, আমপাতা ও নীল শাড়ী — প্রকৃতিপুরুষ বানান রীতিতে সম্পাদিত।